মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত উচ্চ শুল্ক নিয়ে গোটা বিশ্বে চলছে তোলপাড়, বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ। এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘পিংক ট্যারিফ’। কারণ বাণিজ্যনীতিতে ট্রাম্প ব্যাপক পরিবর্তন আনলেও ‘বৈষম্যমূলক’ এ শুল্কে কোনো রদবদলের ঘোষণা আসেনি।
পিংক ট্যারিফ শব্দটি মূলত নারীদের পোশাককেন্দ্রিক। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, এ শুল্কনীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পুরুষদের তুলনায় পোশাক কিনতে বেশি খরচ করছেন নারীরা।
একই ধরনের পোশাক হলেও আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের জন্য বেশি শুল্ক প্রযোজ্য হয়। যেমন ২০১৭ সালে নারীদের স্যুটে শুল্ক হার ছিল ১৫ দশমিক ১ আর পুরুষদের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
পিংক ট্যারিফের কারণে প্রতি পোশাকে পুরুষের তুলনায় নারীরা গড়ে ১ ডলার বেশি খরচ করেন। এতে মার্কিন নারীরা প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি ডলার বেশি খরচ করেন বলে জানিয়েছেন গবেষণা সংস্থা প্রগ্রেসিভ পলিসি ইনস্টিটিউটের বাণিজ্যবিষয়ক গবেষক এডওয়ার্ড গ্রেসার।
এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিদেশী পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ বা এর চেয়েও বেশি হারে নতুন শুল্ক বসাচ্ছেন, তখন নারীদের খরচ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট স্টিভ লামার বলেন, ‘ট্রাম্প নতুন শুল্ক আরোপ করলেও তিনি পুরনো নারীবিদ্বেষী শুল্ক ব্যবস্থার কোনো সংস্কার করছেন না।’
যুক্তরাষ্ট্রের হরমোনাইজড ট্যারিফ শিডিউলে (এইচটিএস) পোশাক ও জুতা লিঙ্গভেদে আলাদা আলাদা ভাগে রাখা হয়। এতে ২০২২ সালে নারীদের পোশাকে গড় শুল্ক ছিল ১৬ দশমিক ৭, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নারীদের জন্য শুল্ক গড়ে ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
তবে এ বৈষম্যের পেছনে কোনো একক কারণ নেই। কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে এ রীতি গড়ে উঠেছে। গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে যখন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি গড়ে তুলছিল, তখন পুরুষদের পোশাক ছিল বড় শিল্প। ফলে ‘দেনদরবার’ করে কোম্পানিগুলো পুরুষদের পোশাকের ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে নেয়। ওই সময় নারীদের পোশাক নিয়ে কেউ তেমন কথা বলেননি।
বিভিন্ন সময়ে অনেক কোম্পানি এ বৈষম্য দূর করতে চেষ্টা করেছে। স্টিভ ম্যাডেন, অ্যাসিক্স, কলাম্বিয়া স্পোর্টসওয়্যারসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ২০০৭ সালে বৈষম্যমূলক শুল্কনীতির বিরুদ্ধে আদালতে আপত্তি তুলেছিল। তবে আদালত বলেছে, এ শুল্ক ইচ্ছাকৃতভাবে বৈষম্যমূলক নয়। এ কারণেই মামলাটি খারিজ হয়ে যায়।
সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে খুব একটা পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তবে গত বছর ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য লিজি ফ্লেচার ও ব্রিটানি পিটারসেন ‘পিংক ট্যারিফ স্টাডি অ্যাক্ট’ নামে একটি বিল আনেন। যেখানে এ শুল্কের প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলা হয়।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরি টেইলর অবশ্য বলেন, ‘ট্রাম্পের নতুন নীতি পুরুষদের পোশাকের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে এ ব্যবধান কিছুটা কমাতে পারে। যেহেতু নারীরা গড়ে বেশি পোশাক কেনেন, তাই শুল্কের প্রভাবও নারীদের ওপর বেশি পড়বে।’
দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, ২০২৩ সালে গড়ে নারীরা পোশাকের জন্য ৬৫৫ ডলার খরচ করেছেন, যেখানে পুরুষরা করেছেন ৪০৬ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সব পোশাকই আমদানি হয় বলে নতুন শুল্কনীতি এ খাতে বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের মতে, পোশাকের দাম ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
পোশাকের ক্ষেত্রে দেশটিতে শুল্কের বৈষম্য শুধু নারী-পুরুষ নয়, ধনী-গরিবের মধ্যেও আছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বেশির ভাগ খরচ হয় মোজা, আন্ডারওয়্যার, টি-শার্ট, সস্তা জুতার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে। এসব পণ্যে শুল্ক হার বেশি। অন্যদিকে উল বা সিল্কসহ বিলাসবহুল উপকরণ ব্যবহার হয়, এমন পোশাকে শুল্ক তুলনামূলক কম।